ঈশ্বরদী একসময় রাজশাহী ও পাবনা অঞ্চলের অঙ্গীভূত ছিল। পদ্মাতীরে অবস্থিত গণ্ডগ্রাম ঈশ্বরদীর সেকালেও অবস্থানগত গুরুত্ব ছিল। যতদূর জানা যায়, নবাবি আমলে মুর্শিদাবাদ থেকে রাজশাহী-বোয়ালিয়া-বাঘা-লালপুর হয়ে ঈশ্বরদীর মধ্য দিয়ে পাবনার নাজিরপুর পর্যন্ত একটি রাস্তা ছিল। ওই রাস্তা দিয়ে শাহি সৈন্যদের যাতায়াত ছিল। পদ্মার তীর ঘেঁষে তৈরি সেই রাস্তার নাজিরপুর-সাঁড়া (ঈশ্বরদী) অংশটি ভাঙনে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও একালের ঈশ্বরদী (বর্তমান এয়ারপোর্ট রোড)-আড়ামবাড়িয়া-লালপুর-বাঘা হয়ে রাজশাহী থেকে মুর্শিদাবাদ অভিমুখী সেই রাস্তা এখন নবাবগঞ্জ পর্যন্ত এক ব্যস্ততম আন্তঃজেলা মহাসড়কে পরিণত হয়েছে।
জানা যায়, নবাবি আমলের সেই রাস্তা এবং পদ্মা নদীপথেই সম্রাট আকবরের আমলে বাংলাদেশে মোগল বাহিনীর আগমন ঘটেছিল। মোগল সেনাপতি রাজা মানসিংহ এ পথেই পাবনা এসেছিলেন। তখন পাবনার ছাতনি, আটঘরিয়ার একদন্ত, চাটমোহরের অষ্টমণিষা ও মরিচপুরাণ প্রভৃতি স্থানে মোগল সেনারা ছাউনি ফেলেছিলেন। আরো পরে মোগল সুবাদার শাহ সুজাও এসে এখনকার সুজানগর এলাকায় কিছুদিন অবস্থান করেছিলেন।
রাজা মানসিংহ পাবনা এলাকার বিভিন্ন স্থানে সেনা ছাউনি ফেলেই ক্ষান্ত হননি। তিনি যমুনা নদী পার হয়ে ময়মনসিংহ এলাকায় গিয়ে তত্কালীন বাংলার বারোভূঁইয়ার অন্যতম প্রধান ঈশা খাঁর এগারোসিন্দুর দুর্গ অবরোধ করেছিলেন। তবে উভয় পক্ষের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কোনো যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। জনশ্রুতি আছে, দুর্গ অবরোধ করার পর ঈশা খাঁ রাজা মানসিংহকে সম্মুখ সমরে আহ্বান করেন। মানসিংহ ঈশা খাঁর সাহসিকতায় মুগ্ধ হয়ে তার সঙ্গে সন্ধি করেন। পরে মানসিংহের অনুরোধে ঈশা খাঁ মোগল সম্রাট আকবরের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আগ্রা যান। সেখানে সম্রাট আকবরের সঙ্গে সাক্ষাতের পর মোগল সম্রাট ঈশা খাঁকে সুবা বাংলার ২২টি পরগনার (তখন সমস্ত বাংলা ৬৮২টি পরগনায় বিভক্ত ছিল) জমিদারি এবং ‘মসনদ-ই-আলা’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
ঈশা খাঁ সম্ভবত মোগল সেনাদের তত্ত্বাবধানে পাবনা-ঈশ্বরদী-রাজশাহী-বোয়ালিয়া পথে মুর্শিদাবাদ হয়েই আগ্রায় গিয়েছিলেন। তিনি সেই সময় মোগল সম্রাট আকবরের কাছ থেকে যে ২২ পরগনার জমিদারি লাভ করেন, তার কোনো এক পরগনার মধ্যে হয়তো এখনকার ঈশ্বরদী অঞ্চলও অন্তর্ভুক্ত ছিল!
ঈশ্বরদীর নামকরণ ও ঈশা খাঁ
ঈশ্বরদী নামের আদি জনপদটির নামকরণ কবে, কখন ও ঠিক কীভাবে হয়েছিল তার সঠিক ইতিহাস জানা যায় না। তবে এর নামকরণের সঙ্গে তত্কালীন বঙ্গদেশের বারোভূঁইয়াদের অন্যতম ঈশা খাঁর নাম জড়িয়ে আছে। তিনি একসময় তত্কালীন বঙ্গদেশের এক বিস্তীর্ণ এলাকা নিজের অধিকারভুক্ত করেছিলেন। অন্যমতে, সুবা বাংলার মোগল শাসক সুবাদার ইসলাম খাঁর আমলে ঈশা খান নামে একজন প্রাদেশিক শাসনকর্তা ছিলেন। ফলে সেই সময় ঈশ্বরদী এলাকাও উক্ত ঈশা খাঁর অধিকারভুক্ত ছিল। আবার অনেকে মনে করেন, মোগল সম্রাট আকবরের কাছ থেকে ২২ পরগনার জমিদারি লাভ করার পর পাবনা-ঈশ্বরদী হয়ে মুর্শিদাবাদ পর্যন্ত বিস্তৃত নবাবি আমলের রাস্তাটির নিরাপত্তাসহ এতদঞ্চলের শাসন কর্তৃত্ব সুরক্ষার জন্য সম্ভবত সেকালে স্বল্পকালের জন্য হলেও ঈশ্বরদীতে বারোভূঁইয়ার অন্যতম ঈশা খাঁর কোনো অশ্বারোহী বাহিনীর অবস্থান ছিল। এসব সংগত কারণেই এ এলাকার রাজস্ব আদায়ের জন্য সে সময় বারোভূঁইয়া খ্যাত ঈশা খাঁর কোনো ‘ডীহিদার’১ হয়তো ঈশ্বরদীতে নিযুক্ত ছিলেন। সে কারণে স্থানটি ‘ঈশা খাঁর ডিহি’ নামে পরিচিত হয়। লোকমুখে তা হয় ‘ঈ-শা-র-ডী’। পরে রূপান্তরের মাধ্যমে তা ‘ঈশ্বরদী’ নামে পরিচিতি পায়।
সাবেক ব্রিটিশ ও পাকিস্তান, এমনকি বাংলাদেশ আমলে গোটা বিশ শতকজুড়ে এর ইংরেজি বানান ছিল Ishurdi, যা প্রথমে Isha-Khar-Dehi, পরে তা সংক্ষেপিত হয়ে Ishur সঙ্গে Dehi সংযুক্ত হয়ে প্রথমে Ishurdehi এবং পরে তা আরো সংক্ষেপিত হয়ে Ishurdi বানানে রূপান্তরিত হয় বলেই ধারণা করা যায়। অন্যদিকে গুগলে প্রদর্শিত উইকিপিডিয়া অনুযায়ী ঈশ্বরদীর ইংরেজি বানান Ish-shordi গণ্য করে এর অর্থ ঈশ্বরের স্থান (God’s Place) বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেউ কেউ বলেন, প্রাচীনকালের গণ্ডগ্রাম ঈশ্বরদীতে একসময় ‘ঈশ্বরী দেবী’ নামে একজন খ্যাতিমান নারী অথবা ঈশ্বরচন্দ্র নামে কোনো একজন খ্যাতিমান ব্যক্তি ছিলেন। তাদের কারো নামেই স্থানটির নামকরণ হয় ‘ঈশ্বরদী’। তবে এ ধারণার কোনো ইতিহাসভিত্তিক বা যৌক্তিক বিশ্বাসযোগ্যতা না থাকায় তা তাদের ব্যক্তিগত অনুমান বলেই মনে হয়। কেউ কেউ অন্যমত প্রকাশ করে বলেন, বাংলার বারোভূঁইয়াদের অন্যতম ঈশা খাঁ কোনো একসময় পদ্মার পাশ দিয়ে সৈন্যসামন্ত নিয়ে যাতায়াত করার কারণে স্থানটির নাম হয় ‘ঈশাদী’। পরবর্তী সময়ে ঈশা খাঁর ‘ঈশাদী’ থেকেই জনপদটির নাম হয় ‘ঈশ্বরদী’। কিন্তু এ মতের সমর্থনেও কোনো জোরালো যুক্তি নেই। কেননা ইতিহাস সমর্থিত মতে বারোভূঁইয়াদের অন্যতম ঈশা খাঁর রাজত্ব ও বিচরণ ক্ষেত্র ছিল সোনারগাঁ (বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলায়), হযরতনগর ও জঙ্গলবাড়ী (বর্তমান কিশোরগঞ্জ জেলায়) এলাকায়। তাছাড়া বাংলা অভিধান অনুযায়ী ‘ঈশাদী বা ঈসাদি’ শব্দের অর্থ সাক্ষী। সুতরাং অর্থগত দিক থেকে ‘ঈশাদী’র সঙ্গে ঈশা খাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। তবে বাংলা অভিধানে ‘ঈশ’ নামে যে শব্দ দেখা যায়, তার আরেকটি বানানরূপ ‘ঈষ’। ঈশ যেমন ঈশ্বর, দেবতা, রাজা, অধিপতি প্রভৃতি অর্থে ব্যবহূত হয়, তেমনি ‘ঈশ্’ বা ‘ঈষ’ শব্দটির অর্থ লাঙলের (কাঠনির্মিত) দণ্ড বা লাঙলের খাত। সুতরাং ঈশ্বরদী নামের আদি জনপদটিতে প্রাচীনকালে ব্যাপকভাবে কাঠ দিয়ে লাঙলের দণ্ড, তথা ‘ঈশ্’ (বা ঈষ) তৈরি হতো কিনা বা সে কারণে স্থানটি বিখ্যাত হয়ে কালে কালে ‘ঈশ্বরদী’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে কিনা, তাও গবেষণার বিষয়।
আদি ঈশ্বরদী, টেংরী গ্রামে রেলপথ স্থাপন ও ঈশ্বরদী শহরের গোড়াপত্তন
ঈশ্বরদীর বয়স বা প্রাচীনত্ব সম্পর্কে ধারণা পেতে হলে ১. আদি ও পুরনো ঈশ্বরদীর পত্তন, ২. রেল বিভাগের হাত ধরে এ এলাকার টেংরী গ্রামে রেলপথ ও স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে রেলশহর হিসেবে ঈশ্বরদীর পত্তন এবং ৩. ঈশ্বরদী থানা স্থাপিত হওয়া—এ তিনটি কালকে বিবেচনায় নিয়ে প্রশ্নটির সমাধান খোঁজা ছাড়া উপায় নেই।
আদি বা পুরাতন ঈশ্বরদী
পদ্মাতীরবর্তী সাঁড়া যখন এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন আর্থসামাজিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্র ছিল, তখনো ঈশ্বরদী নামের আদি জনপদটি ছিল এক গণ্ডগ্রাম বিশেষ! যদিও তার অবস্থান ছিল সেকালের অন্যতম নদীবন্দর সাঁড়াঘাটের কাছেই, মাত্র তিন-চার কিলোমিটারের মধ্যেই।
বর্তমানে ঈশ্বরদীর প্রশাসনিক কাগজপত্রে ‘পুরাতন ঈশ্বরদী’ এবং পার্শ্ববর্তী লালপুর থানার ‘ঈশ্বরদী’ নামে পরিচিত অখণ্ড জনপদই আদি ঈশ্বরদী। এ জনপদের এক ক্ষুদ্রাংশ পাবনা জেলায় এবং বেশির ভাগ অংশ বর্তমান নাটোর (পূর্বতন রাজশাহী) জেলার লালপুর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হলেও এককালে তা ছিল ভৌগোলিকভাবে একটি অখণ্ড জনপদ এবং তার নাম ছিল ঈশ্বরদী। উভয় জেলার মধ্যে বিস্তৃত ঈশ্বরদী নামের জনপদটিতে ঠিক কবে, কখন, কীভাবে মানুষের বসতি গড়ে উঠেছিল, সে ইতিহাস কারো জানা নেই। তাই সঠিকভাবে ওই জনপদটির বয়স বা প্রাচীনত্ব নির্ধারণ করাও সম্ভব নয়।
তবে জনপদটি অতীতে গণ্ডগ্রাম ছিল। এখনো প্রায় তেমনটিই আছে। রাধারমণ সাহা রচিত ‘পাবনা জেলার ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে ১৯২৬ সালের তত্কালীন ঈশ্বরদী সম্পর্কে যা জানা যায়, তা হচ্ছে—
ঈশ্বরদী নামক গ্রামের কতকাংশ রাজশাহী জেলায় অবস্থিত হইলেও রেলস্টেশন ও বাজারাদি সম্পূর্ণই পাবনা জেলার সীমার অন্তর্গত। খাস ঈশ্বরদী গ্রামে কয়েক ঘর চাষী কৈবর্ত বা মাহিষ্য প্রমুখ হিন্দু ও মুসলমান ব্যতীত কোনো স্থায়ী অধিবাসী নাই।
সুতরাং এখন থেকে ৯০ বছর আগেও পাবনা জেলা অংশের (তত্কালীন সাঁড়া থানার অন্তর্গত) আদি ঈশ্বরদী ছিল নেহায়েত এক পশ্চাত্পদ গ্রাম। তবে তত্কালীন রাজশাহী জেলার (বর্তমানে নাটোর জেলা) লালপুর থানার অন্তর্গত ‘ঈশ্বরদী’র মানসম্মান পাবনা অংশের ঈশ্বরদীর মতো অতটা ছোট বা হীন ছিল না, এখনো নেই! কেননা লালপুর থানার (বর্তমানে লালপুর উপজেলা) অন্তর্গত ‘ঈশ্বরদী’ নামের জনপদটি ১৯৩২ সাল থেকে ওই থানার একটি ইউনিয়ন হিসেবে শেষ পর্যন্ত তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। লালপুর উপজেলা অংশের ঈশ্বরদী ওই উপজেলার ২ নং ইউনিয়নের মর্যাদা নিয়ে বিদ্যমান আছে। বর্তমানে ঈশ্বরদী-বাঘা সড়কের বাম পাশে গৌরীপুরে ‘ঈশ্বরদী ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স’ ভবন অবস্থিত, যা ২০০৮ সালে নির্মিত হয়েছে।
রেলশহর হিসেবে আধুনিক ঈশ্বরদীর পত্তন
১৮৭৫-৭৭ পর্যন্ত বাংলাদেশে ভীষণ দুর্ভিক্ষ হয়। ওই দুর্ভিক্ষ নিবারণে খাদ্যদ্রব্য পরিবহনের সুবিধার্থে উত্তরবঙ্গে রেললাইন স্থাপনের জন্য তত্কালীন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীর উদ্যোগে ‘নর্দার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে’ নামে রেলওয়ের একটি শাখা খোলা হয় এবং সাঁড়াঘাট থেকে শিলিগুড়ি এবং পার্বতীপুর থেকে একদিকে দিনাজপুর ও অন্যদিকে কাউনিয়া পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন করা হয়। ১৮৮৪ সালে সাঁড়াঘাট রেলস্টেশন থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরু হয়। ফলে ওই সময় সাঁড়াঘাটের গুরুত্ব নতুনভাবে বাড়ে এবং সাঁড়া ও দামুকদিয়া ঘাটের মধ্যে স্টিমার সার্ভিস চালু হয় রেল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে।
‘ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে’ তখন সাঁড়া থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত যে মিটার গেজ রেললাইন স্থাপন করে তা মাজদিয়া ও বর্তমান ঈশ্বরদী এয়ারপোর্টের রানওয়ের মধ্য দিয়ে গোপালপুর (বর্তমান আজিমনগর রেলস্টেশন) রেলস্টেশন অভিমুখী লাইনের
সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এখনো কোনো কোনো স্থানে সেই রেলপথের কিছু চিহ্ন চোখে পড়লেও অনেক আগেই এ রেলপথ পরিত্যক্ত হয়েছে। উল্লেখ্য, একসময় কোম্পানির কাছ থেকে ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে’র কর্তৃত্ব সরাসরি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকার কর্তৃক গ্রহণ করার পর এর নাম হয় ‘ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ে’ (ইবিআর)।
এই ইস্ট বেঙ্গল রেলওয়ের পক্ষ থেকে ১৯০৯ সাল নাগাদ পাকশীতে পদ্মা নদীর ওপর একটি রেলসেতু, ওই সেতুর পূর্ব প্রান্ত থেকে বর্তমান ঈশ্বরদী (তত্কালীন টেংরী গ্রাম) পর্যন্ত নতুন ব্রড গেজ রেললাইন স্থাপন ও তত্কালীন সাঁড়াঘাট স্টেশন থেকে গোপালপুর শিলিগুড়ি লাইনের সঙ্গে সংযুক্ত করা, পাকশীতে ও টেংরীতে দুটি রেলস্টেশন স্থাপন, টেংরী রেলস্টেশন থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ৫০ মাইল নতুন ব্রড গেজ রেলপথ নির্মাণ এবং টেংরী গ্রামের রেলস্টেশনের নাম ‘ঈশ্বরদী জংশন’ নামকরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেসব সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ১৯০৯ সালে পাকশীতে রেলসেতু (প্রথমে সেতুটি পরিচিতি পায় ‘সাঁড়ার পুল’ নামে। তবে নির্মাণ শেষে তত্কালীন ভারতের বড়লাট লর্ড হার্ডিঞ্জের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ‘হার্ডিঞ্জ সেতু’) নির্মাণকাজ শুরু হয়। নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯১৫ সালের গোড়াতে। তা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় ৪ মার্চ ১৯১৫। উদ্বোধন করেন তত্কালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারতের ভাইসরয় (বড়লাট) লর্ড হার্ডিঞ্জ।
অন্যদিকে এ সময় পাকশীতে সেতুর পূর্ব প্রান্ত থেকে একটি নতুন ব্রড গেজ রেলপথ নির্মাণ করে টেংরী গ্রামের (বর্তমান ঈশ্বরদী শহর এলাকা) মধ্য দিয়ে সেই রেলপথ পূর্ববর্তী সাঁড়াঘাট রেলস্টেশন থেকে শিলিগুড়িগামী রেলপথের সঙ্গে গোপালপুরের কাছে সংযুক্ত করা হয়। এ সময় টেংরী গ্রামে একটি রেলস্টেশনও স্থাপন করা হয়। তবে টেংরী গ্রামকে পূর্ব ও পশ্চিম দুই ভাগে ভাগ করে রেললাইন ও রেলস্টেশন স্থাপন করা হলেও সে সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রেলস্টেশনটির নামকরণ করে ‘ঈশ্বরদী’।
টেংরী গ্রামে স্থাপিত রেলস্টেশনের নামকরণ করা হয় ‘ঈশ্বরদী’
টেংরী গ্রামে স্থাপিত রেলস্টেশনটির নামকরণ কেন ‘ঈশ্বরদী’ করা হয়েছিল, তার সঠিক জবাব হয়তো একমাত্র রেল কর্তৃপক্ষই দিতে পারবে তাদের অতি পুরনো ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে’র কাগজপত্র ঘেঁটে।
তবে সাধারণভাবে দেখা যায়, একটি নতুন রেলপথের যেসব স্থানে রেলস্টেশন স্থাপন করা হয়, তার নামকরণ করা হয় সেই স্থান যে গ্রামের মধ্য দিয়ে রেলপথ নির্মিত হয়েছে সেই গ্রামের নাম বা ক্ষেত্রবিশেষে নিকটবর্তী কোনো খ্যাতনামা স্থানের নামের ভিত্তিতে। আবার বিরল ব্যতিক্রম হলেও কোনো নিকটবর্তী খ্যাতনামা বংশ বা বংশীয় পদবি বা ব্যক্তিবিশেষের নামেও রেলস্টেশনের নামকরণের উদাহরণ আছে। যেমন ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ লাইনের লাহিড়ীমোহনপুর স্টেশন। মোহনপুরের বিখ্যাত লাহিড়ী পরিবারের (এককালের স্থানীয় জমিদার ও রাজনৈতিক পরিবার) বংশীয় লাহিড়ী পদবি যুক্ত করে স্টেশনটির নামকরণ হয় ‘লাহিড়ীমোহনপুর’।
১৯১৫-১৭ সালের মধ্যে যখন টেংরী গ্রামে রেলস্টেশন স্থাপন ও চালু করা হয়, তখন টেংরী গ্রাম আর ঈশ্বরদী গ্রামের অবস্থা কেমন ছিল অথবা ঈশ্বরদী গ্রামের কি আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য বা পরিচিতি ছিল, যে কারণে ঈশ্বরদী গ্রামের নামে নামকরণ করা হয় টেংরী গ্রামে স্থাপিত রেলস্টেশনটির?
যতদূর জানা যায়, ১৯১৫ সাল নাগাদ টেংরী গ্রাম ছিল অখ্যাত এক অজগ্রাম। সেখানে তখন না ছিল হাটবাজার (সাপ্তাহিক নামকরা হাট ছিল অরণকোলায়), না ছিল কোনো সরকারি অফিস-আদালত, না ছিল কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও! আর দশটি গ্রামে যেমন সাধারণ জনবসতি থাকে, এখানেও তেমন কিছু জনবসতি ছিল। এর সংলগ্ন বেশির ভাগ এলাকাই ছিল ঝোপজঙ্গলে ভরা! সে সময় এখানে থাকার মধ্যে ছিল দুটি রাস্তা। রাস্তা দুটি এঁকেবেঁকে সংযুক্ত ছিল মুর্শিদাবাদ থেকে রাজশাহী-বাঘা হয়ে পদ্মার তীরঘেঁষে শাহি আমলে নির্মিত পাবনা-নাজিরগঞ্জ পর্যন্ত প্রসারিত রাস্তার সঙ্গে, যার অংশবিশেষ নানা ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে বর্তমান এয়ারপোর্ট সড়কে (আড়ামবাড়িয়া-গৌরী-লালপুরগামী রাস্তা) পরিণত হয়েছে। টেংরী গ্রামের রাস্তা দুটি ছিল (এখনো আছে)-১. এখনকার এয়ারপোর্ট সড়ক থেকে অরণকোলা হয়ে পাবনাগামী রাস্তা এবং ২. শেরশাহ সড়ক। সে সময় টেংরী গ্রামসংলগ্ন এলাকার মধ্যে একমাত্র অরণকোলাই ছিল সাপ্তাহিক ও অর্ধসাপ্তাহিক হাটকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্র।
১৯১৫ সাল নাগাদ তত্কালীন আদি ঈশ্বরদী গ্রামের (বর্তমান ঈশ্বরদী এয়ারপোর্ট সংলগ্ন) অবস্থাও টেংরী গ্রামের চেয়ে খুব একটা ভালো ছিল না। তবে সেখানে থাকার মধ্যে ছিল সাঁড়াঘাট স্টেশন থেকে গোপালপুরগামী রেলপথের মধ্যে ঈশ্বরদী এলাকায় একটি রেলগেট (রেলক্রসিং), যার নাম ছিল ঈশ্বরদী রেলগেট। রেলগেটটি ছিল বর্তমান ভাদুরপাড়ার সন্নিকটে টেংরী গ্রাম হতে আড়ামবাড়িয়া-গৌরীপুর-লালপুরগামী রাস্তার ওপরে। কেননা এ রাস্তার ওপর দিয়েই গোপালপুরগামী (সাঁড়া থেকে শিলিগুড়ি) রেলপথ নির্মিত হয়েছিল ১৮৮৪ সালে।
তবে সরেজমিন অনুসন্ধানের সময় পুরনো ঈশ্বরদী ও জুকাদহ গ্রামের প্রবীণ কিছু ব্যক্তি জানান, তত্কালীন ঈশ্বরদী রেলগেট এবং জুকাদহ গ্রামের মধ্যে একটি রেলস্টেশনও ছিল, যার নাম ছিল ‘ঈশ্বরদী’। ওই রেলগেট এবং সংলগ্ন রেলস্টেশনের রক্ষণাবেক্ষণ ও দেখভালের জন্য রেলগেটটির কাছেই ছিল একটি গুমটিঘর এবং জুকাদহ গ্রামে ছিল টিনের চালাবিশিষ্ট তিন-চারটি পাকা আবাসিক বাসা-বাড়ি, যেখানে সংশ্লিষ্ট রেলকর্মচারীরা বসবাস করতেন। এছাড়া জুকাদহতে ছিল একটি বড়সড় পাকা ইঁদারা। কিছুকাল আগে ইঁদারাটি স্থানীয় বাসিন্দারা মাটি দিয়ে ভরাট করে দেয়ার আগেও তা দৃশ্যমান ছিল। অন্যদিকে রেলের পাকা ঘরগুলো ১৯১৫ সালে সাঁড়া গোপালপুর লাইন পরিত্যক্ত হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে ভেঙেচুরে নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে স্থানীয়রা।
ধারণা করা যায়, সে সময় রাজশাহীগামী বর্তমান এয়ারপোর্ট-আড়ামবাড়িয়া সড়কটি আন্তঃজেলা (পাবনা ও রাজশাহী) সংযোগের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হওয়ায় ওই সড়কের ওপরে স্থাপিত ‘ঈশ্বরদী রেলগেট’টি নানা কারণে গুরুত্বপূর্ণ ও পরিচিত হয়ে উঠেছিল। ১৯১৫-১৭ সালের মধ্যে টেংরী গ্রামে রেললাইন নির্মাণ ও রেলস্টেশন স্থাপন ও চালু করার সময় আদি ঈশ্বরদী গ্রামের রেলগেটটিও স্থানান্তরিত হয়ে আসে টেংরী গ্রামের বর্তমান (ঈশ্বরদী রেলগেট) স্থানে।
সম্ভবত এসব সংগত কারণেই টেংরী গ্রামে স্থাপিত হওয়া সত্ত্বেও রেলস্টেশনটির নামকরণ হয় ‘ঈশ্বরদী’।
অন্যদিকে হার্ডিঞ্জ সেতুর নির্মাণকাজ চলাকালেই পাকশী থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত নতুন ব্রড গেজ রেললাইন স্থাপন, পাকশী ও ঈশ্বরদীতে প্লাটফর্মসহ স্টেশন নির্মাণ ও উভয় স্থানে রেলওয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সব স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। যতদূর জানা যায়, ১৯১৩ সালের মধ্যে পাকশীর হার্ডিঞ্জ সেতু প্রান্ত থেকে ঈশ্বরদী লোকো এলাকা পর্যন্ত রেলওয়ের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সেতু বা সাঁকো নির্মাণ হয়, তার ওপর দিয়ে নতুন রেললাইন স্থাপনের জন্য। ঈশ্বরদী রেলগেটের উত্তর পাশের সেতু এবং লোকোশেডের উত্তর-পশ্চিম পাশের জোড়া সাঁকোর নির্মাণকাজ ১৯১৩ সালেই শেষ হয়। এরপর ১৯১৭ সালের মধ্যে নির্মিত হয় ঈশ্বরদী রেলওয়ে প্লাটফর্ম ও তার উপরিস্থিত অফিস ভবনাদি, স্টেশন মাস্টারের বাসভবন, রেলওয়ে ওভারব্রিজ, বুকিং অফিস, রানিং রুমসহ রেলের প্রয়োজনীয় স্থাপনাসমূহ। সম্ভবত এরপর ১৯২৪ সালের মধ্যে নির্মিত হয় লোকোশেড, লোকো ফোরম্যানের বাসভবন, রেলওয়ে হাসপাতাল ভবন, নর্থ ও সাউথ কেবিন, রেলওয়ে ইনস্টিটিউটসহ অন্যান্য স্থাপনা এবং রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেক আবাসিক ভবনাদি। এ সময়ের মধ্যেই ঈশ্বরদী থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন রেলপথ চালু হয়। এভাবেই ‘রেলশহর’ হিসেবে বর্তমান শহর ঈশ্বরদীর পত্তন হয়।
সেদিক থেকে বিবেচনা করলে ঈশ্বরদী রেলগেটের উত্তর পাশের সেতু এবং লোকোশেডের উত্তর-পশ্চিম পাশের জোড়াসাঁকোর নির্মাণ সাল ১৯১৩-কে বর্তমান ঈশ্বরদীর গোড়াপত্তন হিসেবে ধরে নিলে এখনকার শহর ঈশ্বরদীর বয়স ২০১৩ সালে শতবর্ষ অতিক্রম করেছে বলে ধরে নেয়া যায়। এ বিবেচনাকে যৌক্তিক বলে ধরে নিলে বর্তমানের ‘শহর ঈশ্বরদী’ অত্যন্ত নীরবে, নিভৃতে সবার উপেক্ষা ও অগোচরেই তার পত্তনের ১০০ বছর অতিক্রম করেছে ২০১৩ সালে! অন্যদিকে ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ হার্ডিঞ্জ সেতুর ওপর দিয়ে প্রথমবারের মতো পদ্মার পশ্চিম পাড়ের রেলস্টেশন ভেড়ামারা থেকে পাকশী হয়ে নবনির্মিত ঈশ্বরদী রেলস্টেশন পর্যন্ত ট্রেন যাতায়াত শুরু হওয়ার তারিখকে বর্তমান ঈশ্বরদী শহর পত্তনের সময় নির্ধারণ করলে ২০১৫ সালের ৩ মার্চ পূর্ণ হয়েছে ঈশ্বরদী শহর পত্তনের শতবর্ষ।
ঈশ্বরদী থানা স্থাপন
১৯২৯ সালের পূর্ব পর্যন্ত বর্তমান ‘শহর ঈশ্বরদী’সহ এ উপজেলার অন্যান্য এলাকা ছিল তত্কালীন সাঁড়া থানার অন্তর্গত। পাবনা জেলা গঠনের পর পাবনা থানার অধীনে তত্কালীন অরণকোলা হাট এলাকায় একটি পুলিশ আউটপোস্ট স্থাপন করা হয়। ১৮৬৫-৭১ সালের মধ্যে কোনো একসময় অরণকোলা আউটপোস্ট স্থানান্তরিত হয় সাঁড়াঘাট এলাকায়। এ আউটপোস্ট বা পুলিশ ফাঁড়িটি ১৯০৩ সালের ৩ জুন পূর্ণাঙ্গ পুলিশ স্টেশন, অর্থাৎ সাঁড়া থানায় উন্নীত হয়।
তবে ১৯১৫ সালের ৪ মার্চ পাকশীর হার্ডিঞ্জ সেতু চালু ও ১৯১৭ সালের মধ্যে ঈশ্বরদী রেল জংশন স্থাপন ও চালুকরণ এবং রেলশহর হিসেবে ঈশ্বরদীর পত্তন, অন্যদিকে সাঁড়াঘাট এলাকা প্রমত্তা পদ্মা কর্তৃক বারবার ভাঙনকবলিত হয়ে বিপন্ন হয়ে পড়া, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পরই পাবনা-ঈশ্বরদী সড়কপথে বাস সার্ভিস চালু হওয়া, জেলা সদর পাবনার সঙ্গে সহজ যোগাযোগসহ অন্যান্য প্রশাসনিক কারণে ১৯২৯ সাল নাগাদ সাঁড়া থেকে পুলিশ স্টেশন তত্কালীন রেলশহর ঈশ্বরদীতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। অবশেষে ১৯২৯ সালের ১০ মে সাঁড়া থেকে পুলিশ স্টেশন, তথা থানা ঈশ্বরদীর বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয়। এর নতুন নামকরণ হয় ‘ঈশ্বরদী থানা’।
সাঁড়া থেকে পুলিশ স্টেশন বর্তমান স্থানে (দরিনারিচা মৌজায়) স্থানান্তরের প্রায় এক যুগ আগেই ‘ঈশ্বরদী রেলস্টেশন ও জংশন’ চালু হওয়ায় এবং তা রেলের রেকর্ডপত্রসহ সরকারের প্রশাসনিক কাগজপত্রে ব্যবহূত হতে থাকার প্রেক্ষাপটেই এ এলাকার রেলস্টেশনের নাম ‘ঈশ্বরদী’-কে বিবেচনায় নিয়েই দরিনারিচা মৌজায় স্থানান্তরিত সাঁড়া থানার নামকরণ হয় ‘ঈশ্বরদী থানা’। এ থানা এলাকার ভৌগোলিক সীমারেখাকে নিয়েই গঠিত হয় প্রশাসনিক থানা, যা আশির দশকে প্রেসিডেন্ট এইচএম এরশাদের শাসনামলে প্রথমে মানোন্নীত থানা এবং পরে উপজেলায় রূপান্তরিত হয়, বর্তমানে যার নাম ‘ঈশ্বরদী উপজেলা’।
১৯২৯ সালে সাঁড়া থেকে স্থানান্তরিত পুলিশ স্টেশনের (বা থানা) নাম সে সময় ‘ঈশ্বরদী থানা’ করা হলেও তার প্রায় এক যুগ আগে থেকেই অবস্থানগত কারণে ‘ঈশ্বরদী জংশন’ ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। ফলে স্থানটি ‘ঈশ্বরদী’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠে। সে কারণে স্থানান্তরিত পুলিশ স্টেশনের নামও হয় ঈশ্বরদী থানা।
টীকা
১. কতিপয় গ্রাম বা মৌজার সমষ্টিকে ফারসি ভাষায় ‘ডীহ’ বা ‘ডিহি’ বলা হয়। আর সেকালে ডিহির প্রধানকে বলা হতো ‘ডিহিদার’ বা ‘ডীহিদার’। সুতরাং ঈশা খাঁর রাজত্বকালে নিযুক্ত ‘ঈশা-খাঁর ডীহিদার’ থেকে মানুষের মুখে মুখে ‘ঈ-শা-র-ডীহি’ ও কালক্রমে তা রূপান্তরিত হয়ে ‘ঈ-শা-র-ডী’ এবং শেষে ‘ঈশ্বরদী’ নামকরণের ধারণাটি অনেকে বিশ্বাস করেন। অনেকে মনে করেন, ঈশ্বরদীর ইংরেজি বানান থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়।
Glimpses of some Moments
Captured the bonding, joy, and laughter in these special moments.
